মঙ্গলবার, ০১ এপ্রিল ২০২৫

|

চৈত্র ১৬ ১৪৩১

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

চাঙ্গা রূপগঞ্জের জামদানি পল্লী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১৭:৪৩, ২৬ মার্চ ২০২৫

চাঙ্গা রূপগঞ্জের জামদানি পল্লী

সংগৃহীত

জামদানি শাড়ির কথা আসলেই চলে আসে রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়ার এলাকার কথা। রূপগঞ্জের নোয়াপাড়াকে জামদানির আঁতুড়ঘর বলা হয়ে থাকে। এ এলাকা থেকেই জামদানি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। এখানে জামদানি শাড়ির ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরোনো। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীদের অতিপরিচিত। এ পেশায় জড়িত প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতি। ঈদ সামনে রেখে তাঁতিদের যেন দম ফেলার সুযোগ নেই। তবে এবার জামদানি পল্লীতে সরাসরি ক্রেতা থেকে অনলাইনে শাড়ি বেশি বিক্রি হচ্ছে জানান তাঁতিরা। ঈদ সামনে রেখে ৬০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রির লক্ষ্য ব্যবসায়ীদের। 

জানা গেছে, রূপগঞ্জের জামদানি সারা দেশ থেকে পাইকাররা এসে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রায় ২০ কোটি টাকার জামদানি ভারত, ভুটান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান তাঁতিরা। এতে আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য জামদানি শাড়ি। এর বিভিন্ন রকম ডিজাইনের মধ্যে অন্যতম পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটতপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলী, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড় ইত্যাদি। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে তাঁতিদের যেন দম ফেলার সুযোগ নেই। পল্লীর ভেতরের দোকানগুলোতে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। জামদানি পল্লীর ভেতরে প্রায় ৩০টি শোরুম রয়েছে। এখানেই পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা নিজেদের পছন্দমতো বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক ডিজাইনের জামদানি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আগে তাঁতিরা শুধু জামদানি শাড়ি তৈরি করলেও বর্তমানে জামদানি দিয়ে পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, টুপিস ও বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করা হয়। এতে করে জামদানির জনপ্রিয়তা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে জামদানি পল্লীতে আসা ক্রেতারা হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ নিয়ে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, ঘিঞ্জি পরিবেশ, জামদানি পল্লীর সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান করেছে বলে দাবি এখানে আসা ক্রেতাদের।

তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দু-তিন বছর বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁতিরা কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হলেও এবার তাদের জামদানি বিক্রি ভালো হচ্ছে। সরাসরি পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা তাদের কাছ থেকে শাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে তারা দামও ভালো পাচ্ছেন। 

এদিকে সরাসরি ক্রেতার পাশাপাশি ই-কমার্স ও সমাজমাধ্যমকে শাড়ি বিক্রির নতুন বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এবারের ঈদে প্রায় ৬০ কোটি টাকার শাড়ি বিক্রির টার্গেট রয়েছে। বর্তমানে পল্লীর তাঁতি ও দোকান মালিকদের সবারই সমাজমাধ্যমে পেজ রয়েছে। সেই পেজের মাধ্যমেই তারা শাড়ি বিক্রি করছেন। এতে তারা বেশ সাড়াও পাচ্ছেন।

জামদানি শাড়ির আধুনিকায়ন ও তাঁতিদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে জামদানি পল্লীতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের পাশাপাশি তারা তাদের তৈরিকৃত শাড়ি বিক্রি করছেন ফেসবুক ও ই-কমার্সে। নিজেদের প্রোফাইল তৈরি অথবা পেজ খুলে নিজেদের তৈরি শাড়ির ছবি আপলোড করে মূল্য লিখে দিচ্ছেন। যাদের পছন্দ হচ্ছে অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে শাড়ি অর্ডার করছেন এবং হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করছেন। শাড়িগুলো বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।

পল্লীর বিসমিল্লাহ জামদানি মালিক আসিফ জানান, গত কয়েক বছর জামদানির বাজার খারাপ গেলেও এবার চাঙ্গা। বাজার চাঙ্গা হওয়ায় তাদের বিক্রিও বেড়েছে। আগে শাড়ি বিক্রি করে তাঁতিদের মজুরি দিতে হিমশিম খেতে হলেও বর্তমানে তিনি বেশ ভালোভাবেই তা পারছেন। তার সমাজমাধ্যম ফেসবুকে একটি পেজ রয়েছে। সেই পেজের মাধ্যমে শাড়ি বিক্রি করছেন। ঈদ সামনে রেখে অনলাইনে বিক্রির পরিমাণ বাড়ছে।

শফিকুল জামদানির মালিক বলেন, আমি কয়েক বছর ধরে দেশের নামিদামি কয়েকটি ব্র্যান্ডের শোরুমে জামদানি বিক্রি করছি। সুতার দাম বাড়ার কারণে আগের মতো ব্যবসা নেই। জামদানি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

সোহাগ জামদানির মালিক জানান, তার বাবা নজরুল ইসলাম ২০ বছর ধরে জামদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। জামদানি পল্লীতে তার বাবার দোকানও রয়েছে। দোকানের পাশাপাশি তার একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। ঈদ সামনে রেখেও অনলাইনে বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে। 

তবে তাঁত কারিগরদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর জামদানির বাজার মন্দার অজুহাতে তাঁতকল মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি বাড়াননি। বিক্রি ও শাড়ির দাম বাড়লেও আগের মজুরিতেই কাজ করছেন তারা। এ কারণেই অনেকেই পেশাবদল করে দিয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে এই মজুরিতে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। 

তাঁতকল মালিকদের দাবি, জামদানি বিক্রি বাড়লেও খরচ অনেক বেড়েছে। দাম বাড়ায় তেমন একটা লাভ হচ্ছে না। তাই কারিগরদের মজুরি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। 

তারাবো পৌরসভার প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশের জন্য জামদানি ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। এ শিল্পের কর্মযজ্ঞ হলো আমাদের রূপগঞ্জে। জামদানি শিল্পকে আরও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সব সময় আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদারকি করে থাকি।